بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

শায়খুল কুররা গাউছে জামান হযরত মাওলানা আব্দুস সুবহান আল-কাদেরী (রাঃ)

মোজাদ্দেদে জামানআলহাজ্ব গাজী শাহসুফিদরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা

১৮৭৬ — ৩ মার্চ ১৯৫৫ ঈসায়ী

শায়খুল কুররা

হেরেম শরীফ থেকে প্রাপ্ত

১০ বছর

বিদেশ সফর ও রিয়াজত

৫ ভাষা

উর্দু, বাংলা, আরবি ও আরো

গাজী

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৭

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বাংলাদেশের সুফি দরবেশদের ইতিহাসে কুমিল্লার শাহপুর দরবার শরীফ একটি উজ্জল নাম। গোমতী নদীর উত্তর পাড় ঘেঁষে পাঁচথুবী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গ্রাম শাহপুর। ইসলামী শরীয়াতের অনুশীলন, কাদেরীয়া তরিকার প্রচার, আত্মশুদ্ধি, কঠোর রিয়াজত, আধ্যাত্মিক শিক্ষা সাধনার জন্য শাহপুর দরবার শরীফ অত্যন্ত পরিচিত। দেশ বিদেশে রয়েছে এ দরবারের লক্ষ লক্ষ আশেক-ভক্ত-মুরিদ।

হযরত নুরুদ্দীন বন্দীশাহ (রা) এর আশেক ও ভক্ত মাওলানা আব্দুস সোবহান আল-কাদেরী (রা) এখানে রিয়াজত সাধনা করতেন এবং শরীয়ত তরিকত চর্চার অন্যতম আধ্যাত্মিক কেন্দ্র শাহপুর দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন।

শাহপুরের ইতিহাস

হযরত নুরুদ্দীন শাহ (রা) নামে একজন মহান জ্ঞান তাপস ভারতের বিহার রাজ্যের ভাগলপুর জেলায় জন্ম নিয়েছিলেন। উনার পূর্ব পুরুষগণ আরব অঞ্চল থেকে বিহারে হিজরত করেন। তিনি ত্রিপুরা অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন।

হযরত নুরুদ্দীন শাহ (রা) একবার বিনা অপরাধে বন্দী হয়েছিলেন এবং জেলখানায় তাঁর অনেক অলৌকিক কারামত প্রকাশ পায়। এজন্য তাকে বন্দীশাহ (রা) বলা হয়। এ সাধক বন্দীশাহ বর্তমান শাহপুর অঞ্চলে আগমন করলে উনার নাম অনুসারে এলাকার নাম হয় "শাহপুর"। শাহপুর দরবার শরীফে বকুল তলে হযরত নুরুদ্দীন বন্দীশাহ (রা) এর পবিত্র মাজার অবস্থিত।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

শাইখুল কুররাহ গাউছে জামান মোজাদ্দেদে জামান আলহাজ্ব গাজী শাহসুফি আব্দুস সোবহান আল কাদেরী (রা)-র জন্ম ১৮৭৬ ইংরেজী। পিতার নাম হযরত সাইয়েদ মীর কাসেম আলী, মাতা হযরত সৈয়দা জোহরা খাতুন, চাঁন্দপুর কুমিল্লা।

বাংলার জমিনে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে পীরানে পীর মাহবুবে সোবহানী সাইয়্যেদেনা হযরত বড় পীর মহিউদ্দিন আব্দুল কাদের জিলানী (রা) এর শাহজাদাগণের মধ্যে পাঁচজন নাতি মোগল আমলে বহু পথ পরিক্রমা অতিক্রম করে ভারত বর্ষ হয়ে বাংলাদেশে আগমন করেন।

শিক্ষা জীবন

বাবা মায়ের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য তিনি কুমিল্লা শহরে হুচ্ছামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায় ভর্তি হন। তিনি তার কঠোর অধ্যবসায় দ্বারা শিক্ষাজীবনে মাদ্রাসার সব শ্রেণীর পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। পাঁচটি ভাষা জানতেন।

রচিত গ্রন্থসমূহ:

1কাসিদায়ে সোবহান
2শোগলে কাদেরী
3দরশে দেল
4মহাসফর
5কেরাত শিক্ষা
6মৌলুদ শরীফ

হজ্ব পালন ও বিদেশ সফর

মায়ের অনুমতি নিয়ে এই মহান সুফিসাধক আল্লাহ তালার উপর পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুল করে মাত্র ২৩ টাকা নিয়ে পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং হজ কার্যক্রম সম্পূর্ণ করেন।

এরপর দীর্ঘ ১০ বছর সময় মক্কা, মদিনা, ইরাক, মিশর, ও ভারত উপমহাদেশসহ বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেন। হেরেম শরীফের ওস্তাদদের নিকট থেকে শায়খ-উল-কুররা ডিগ্রি লাভ করেন।

আধ্যাত্মিক সাধনা

তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত সুফি সাধক শাহ আব্দুল আজিজ (রা) এর কাছে জ্ঞান অর্জন করেন এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। আজমীর শরীফে সুলতানুল হিন্দ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রা), দিল্লিতে হযরত খাজা নিজামুদ্দিন (রা) সহ অনেক আউলিয়া কেরামের জিয়ারত করেন।

কঠোর চিল্লা (আধ্যাত্মিক সাধনা):

এক কেজি চনা বুট খেয়ে ৪০ দিন অতিবাহিত
সাতটি লাং দ্বারা ৪০ দিনের চিল্লা
লবণ-তেল-মসলা বিহীন কচু শাকের সিদ্ধ পানি খেয়ে ৬ মাসের চিল্লা
দিবারাত্র কোরআন তেলাওয়াত ও জিকিরে নিমগ্ন

যেভাবে গাজী হলেন

হযরত মাওলানা আব্দুস সোবহান রাদিউল্লাহ একজন মুজাদ্দেদে জামান ছিলেন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ১৯১৭ সালে প্রথম মহাযুদ্ধে তুরস্কের পক্ষে যুদ্ধ করেন। ব্রিটিশ বন্দীশালায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে বধভূমিতে দণ্ড দেয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে আনীত দণ্ডলিপি অলৌকিকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায় এবং তিনি রক্ষা পান।

কারামত সমূহ

হযরত আবদুল কাদের জীলানী (রা) এর সাক্ষাৎ

আরবে মরুভূমির চোরাবালিতে গাধা পড়ে গেলে 'ইয়া গাউছে পাক' বলার সাথে সাথে জ্যোতির্ময় ব্যক্তি ঘোড়ায় এসে উদ্ধার করেন।

হযরত খিজির (আঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ

নদীর তীরে মনে মনে ইচ্ছা করতেই সাদা পোশাক পরিহিত সুন্দর বৃদ্ধ এসে একসাথে আহার করলেন এবং মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করা

লাল মিয়া ওস্তাদ সাপে কামড়ে মারা গেলে জানাজার পর কবরে নেওয়ার সময় চিৎকার দিয়ে জীবিত হয়ে উঠেন — এরপর আরো ১৫ বছর জীবিত ছিলেন।

ট্রেনের নিচ থেকে উদ্ধার

লাকসাম স্টেশনে ট্রেনের নিচে পড়া ব্যক্তির মাথায় হাত দিয়ে চাপ দিয়ে বললেন 'মাথা উঠিও না' — ট্রেন চলে গেলে তিনি সম্পূর্ণ অক্ষত বেঁচে যান।

সমাজ সেবা

সমাজে মুসলমানরা মাছ ধরা, চুলকাটা, পান চাষ ও বিক্রি করাকে হেও চোখে দেখত। হুজুর নিজে তাদেরকে এসব পেশায় নিয়োজিত করে ব্যবসায় সুন্নতের অনুসারী করেন। এতে অনেক দরিদ্র শ্রেণীর লোক সফল ও বিত্তবান হয়ে ওঠেন।

শিক্ষা বিস্তারে সমাজকে উৎসাহিত করে স্বাবলম্বী জীবন যাপনের নির্দেশ ও উৎসাহ দিতেন। মদিনার মডেলের মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বহু পরিশ্রম করেন।

কর্ম জীবন

হযরত শাহ আব্দুস সোবহান আল কাদেরী (রাঃ) চাঁনপুর জেলার জামরাবাদ মাদ্রাসায় এবং কুমিল্লা ইউসুফ হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তার পিতার ইন্তেকালের পর মায়ের সেবা এবং একমাত্র ছোট বোনের বিবাহ — ভাইদের প্রতি দায়দায়িত্ব তিনি পালন করেন।

ওফাত

আল্লাহ প্রদত্ত সব দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করার পর গাউছে জামান হযরত শাহ আব্দুস সোবহান আল কাদেরী পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

১৯৫৫ সালের ৩ মার্চ বৃহস্পতিবার রাত নয়টায় তিনি পরলোক গমন করেন। উপস্থিত স্বজনদের সাক্ষ্য অনুসারে মৃত্যুকালে তার মুখ থেকে এক টুকরা উজ্জ্বল আলোকপিণ্ড বের হয়ে যায়।

প্রতিবছর নির্দিষ্ট তারিখের সম্পূর্ণ শরীয়ত সম্মত ভাবে শাহ আব্দুস সুবহান আল কাদেরী (রাঃ) এর বার্ষিক উরুশ শরীফ কুমিল্লার শাহপুর দরবার শরীফে অনুষ্ঠিত হয়।